জায়নামাজ খুঁজি কোরআন পড়ি ঘুম থেকে উঠে

সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে আগে আমি জায়নামাজ খুঁজি। নামাজ পড়ি। কোরআন তিলাওয়াত করি। তারপর এক কাপ চা নিজে বানাই। এরপর বই-টই পড়ি। করোনাকালে সকালে কিছু সময় হাঁটাহাঁটি করার পর গণভবনের লেকে ছিপ দিয়ে মাছ ধরি।’ গতকাল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমামের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, তিনি ঘুম থেকে উঠে মোবাইল ফোন খোঁজেন, তার স্ত্রী ঘরদোর পরিষ্কার করতে ঝাড়ু খোঁজেন। প্রধানমন্ত্রী ঘুম থেকে উঠে কী খোঁজেন?

জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সকালে উঠে আমি জায়নামাজ খুঁজি। আগে নামাজ পড়ি। নামাজ শেষে কোরআন তিলাওয়াত করি। তারপর এক কাপ চা নিজে বানাই। সকালের চা আমি নিজে বানিয়ে খাই। চা-কফি যা-ই খাই নিজে বানিয়ে খাই। ছোট বোন বাসায় থাকলে দুজনের যে আগে ওঠে সে বানায়। মেয়ে পুতুল আছে। সে-ও আগে উঠলে বানায়। তার আগে ঘুম থেকে ওঠার পর নিজের বিছানাটা গুছিয়ে রাখি। এরপর বই-টই যা পড়ার পড়ি। আর ইদানীং করোনাভাইরাসের পরে সকালে একটু হাঁটতে বের হই। তবে আরেকটা কাজ করি এখন। সেটা বললে কী হবে (হেসে ফেলেন)। গণভবনে একটি লেক রয়েছে। হাঁটার পরে লেকের পাড়ে যখন বসি, তখন ছিপ নিয়ে বসি। মাছ ধরি।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা আরও বলেন, ‘আব্বার নির্দেশ ছিল একজন রিকশাওয়ালাকেও আপনি বলে সম্বোধন করতে হবে। ড্রাইভারকে ড্রাইভার সাহেব বলতে হবে। কাজের যারা লোকজন, তাদের কখনো চাকরবাকর বলা যাবে না। হুকুম দেওয়া যাবে না। তাদের কাছে কিছু চাইতে হলে সম্মান করে, ভদ্রভাবে চাইতে হবে। যে কারণে আমি প্রধানমন্ত্রী হতে পারি, যত দূর পারি নিজে করে খাই। কিন্তু এখনো আমার বাড়িতে কাজের মেয়ে যারা আছে, কারও কাছে যদি এক গ্লাস পানিও কখনো চাইতে হয়, তাদের জিজ্ঞাসা করি, আমাদের এটা দিতে পারবে? এ শিক্ষাটা আমরা নিয়ে আসছি। এ শিক্ষা বাবা আমাদের দিয়ে গেছেন। এখনো মেনে চলি। আমরা সবাইকে সমান সমাদর করি। বরং যাদের কিছু নেই, তাদের দিকে একটু বেশি নজর দিই।’
অপরাধী আমার দলের লোক হলেও ছাড়ব না : বিএনপির এমপি হারুনুর রশীদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ইউএনওর যেই ঘটনা ঘটে গেছে, সেটা তদন্ত করে দোষীদের কিন্তু গ্রেফতার করাও হয়েছে, গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং বিষয়টা কী খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কিছু কিছু বলছে যে চুরি করার জন্য, শুধু চুরি না, এর সঙ্গে আরও কী কী ঘটনা থাকতে পারে, সেগুলোও কিন্তু যথাযথভাবে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনার মূলে কী আছে? কেন এ ধরনের একটা ঘটনা ঘটল? এটা খুব ভালোভাবেই তদন্ত হচ্ছে। তদন্তে কোনো ঘাটতি হবে না। অপরাধী ঠিকই শাস্তি পাবে। সেই ব্যবস্থা করব, অন্তত এইটুকু আমি বলতে পারি। সেখানে যদি আমার দলেরও লোক হয়, সমর্থক হয়, তাকেও আমি ছাড়ি না, ছাড়ব না। এটা হলো আমার নীতি।’ এ সময় তিনি অপরাধীদের রক্ষা না করতে দলীয় এমপিদের প্রতিও আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী ২ সেপ্টেম্বর রাতে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার পর তাকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নিয়ে আসা, তার চিকিৎসা থেকে শুরু করে সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন।

করোনাভাইরাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাজের প্রশংসা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা এত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে, তাদের এভাবে আঘাত করে, এটা তো কখনো গ্রহণযোগ্য না। ইতিমধ্যে অপরাধী শনাক্ত করা বা তাদের ধরা হয়েছে এবং এর পেছনে তাদের সঙ্গে আরও কারা কারা আছে, কাদের মদদে করেছে, সেটাও কিন্তু তদন্ত করা হচ্ছে। এটা খুব ভালোভাবেই তদন্ত হচ্ছে। তদন্তে কোনো ঘাটতি নেই এবং ঘাটতি হবে না। অপরাধী ঠিকই শাস্তি পাবে। সে ব্যবস্থা করব, অন্তত এইটুকু আমি বলতে পারি।’

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি অপরাধী আমার চোখে অপরাধী। সে কোন দলের কে, কী আমি কিন্তু সেটা বিচার করি না। সেটা আপনারা দেখেছেন।’ প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমাদের কেউ যেন, আপনারাও যারা সংসদ সদস্য আছেন, তাদের কাছেও অনুরোধ থাকবে, যেন এ ধরনের অপরাধীদের কখনো রক্ষা করার চেষ্টা না করেন। অপরাধ যে করে, আর অপরাধীকে যে রক্ষা করে, সমানভাবেই তারা দোষী।’

যখনই যে ঘটনা ঘটেছে সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিই : বিএনপির সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘কথাটা তো বাস্তব, এভাবে ঘরে ঘরে, বেডরুমে বেডরুমে কেউ পাহারা দিতে পারে না। তার পরও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য এবং দেশে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে তার জন্য যথযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সব সময় সজাগ রয়েছি, ব্যবস্থা নিচ্ছি। যখনই যে ঘটনা ঘটেছে আমরা সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিই।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইউএনও ওয়াহিদার ক্ষেত্রে যেটা ঘটেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। বাড়ির ভিতরে ঢুকে এভাবে আক্রমণ করা বা হাতুড়ি দিয়ে পেটানো…। চোর ঢোকে চুরি করতে কিন্তু এভাবে একজন সরকারি কর্মচারীর ওপর হামলা করা এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এর বিরুদ্ধে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

এমপি সিরাজ প্রশ্ন করতে গিয়ে বলেন, ‘সাগর-রুনি হত্যার পর শুনেছিলাম বেডরুম পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের নয়। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানমকে সরকারি বাসভবনে নিজের বেডরুমে মারত্মকভাবে জখম করা হয়েছে। আমার প্রশ্ন এই কর্মকর্তার বেডরুম পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব কার ছিল? আর বেডরুম নয়, নিজের দেশ আর দেশবাসীর পাহারা দেওয়ার দায়িত্বটা কার?’

জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘একটা কথা আপনারা জানেন বাংলাদেশে কী ঘটনাটা না ঘটেছে? পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট তো ঘরে ঢুকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তখন তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তাঁর গোটা পরিবারকেই হত্যা করা হয়েছে। সেই খুনিদের ইনডেমনিটি দিয়ে বিচারের হাত থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। সেই খুনি ক্রিমিনালকে যখন প্রশ্রয় দেওয়া হয়, মানসিকভাবে সেই দেশের মানুষের কী রকম চরিত্র হতে পারে? সেটাই হচ্ছে বিবেচ্য বিষয়। সেখান থেকে একটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা, ডিসিপ্লিনে নিয়ে আসা এবং অন্যায়কারীদের যেন শাস্তি হয়, বিচার হয় সেই ব্যবস্থা নেওয়া, এটা সব থেকে বড় কাজ। ঘটনা যে কোনো সময়ে ঘটতে পারে। কিন্তু সেই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে যারা অপরাধী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি কিনা, সেটাই হচ্ছে বড় প্রশ্ন।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যে দেশে খুনিদের পুরস্কৃত করা হয় দূতাবাসে চাকরি দিয়ে, যে দেশে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে, সে দেশটাকে ডিসিপ্লিনে ফিরিয়ে আনা, সে দেশকে নিয়ন্ত্রণে এনে নিয়মমাফিক চালানো খুব কঠিন একটা দায়িত্ব। সে দায়িত্বটা তো আমরা সরকারে আসার পর পালন করে যাচ্ছি। যেখানে পাঁচ শটা বোমা হামলা হয়েছে, প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী-অস্ত্রধারীরা অস্ত্র নিয়ে মিছিল করেছে। এ ধরনের বহু ঘটনা তো আমাদের দেশে ছিল। কিন্তু সেগুলো আমরা আস্তে আস্তে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি। তারপর এত জনসংখ্যা, এত ঘনবসতির একটি দেশে খুব কঠিন একটা কাজ। তার পরও কিন্তু আমরা করে যাচ্ছি। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা যথেষ্ট সক্রিয় আছে। যখনই যে ঘটনা ঘটেছে আমরা সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিই।’

টিকা কেনাসহ করোনা মোকাবিলায় উদ্যোগ : জাতীয় পার্টির এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় দ্রুত কভিড-১৯-এর টিকা কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গত মে-জুনে জরুরি ভিত্তিতে ২ হাজার চিকিৎসক, ৫ হাজার সিনিয়র স্টাফনার্স, ৩৮১ জন ফার্মাসিস্ট এবং জুলাইয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় ২০২ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরও ২ হাজার চিকিৎসক, ২ হাজার ৫৫০ সিনিয়র স্টাফনার্স ও ১ হাজার ৮৫০ মিডওয়াইফারি নিয়োগের কার্যক্রম চলছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY