বিজেএমসির কম দামে বস্তা বিক্রির চুক্তি

বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশন (বিজেএমসি) কম দামে সুদানি এক নাগরিকের কাছে পাটের বস্তা বিক্রির জন্য একটি চুক্তি করেছে দুবাইভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। চুক্তির ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর পাশাপাশি কম দামে বস্তা বিক্রির কারণে বিজেএমসির ক্ষতি হবে অন্তত ৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে দাম কমানোর কারণে ক্ষতি হবে আট কোটি টাকা আর প্রণোদনা বাবদ ক্ষতির পরিমাণ ২৬ কোটি টাকার বেশি।

বিজেএমসির পক্ষপাতমূলক এই সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। লাভবান হবেন দেশের স্বার্থবিরোধী সুদানি ওই নাগরিক। কারণ সুদানি ওই নাগরিক সে দেশে বাংলাদেশের অনারারি কনসাল ছিলেন। ওই দায়িত্ব পালনকালে তিনি বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ায় সরকার তাঁকে অনারারি কনসালের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়।

অব্যাহত লোকসানের কারণে গত জুলাই মাসে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ২২টি পাটকল বন্ধ করে দেয়। ওই সব পাটকলে এক লাখ ৩৫ বেল ‘স্ট্যান্ডার্ড বি টুইল ব্যাগ’ (৮০ কেজির পাটের বস্তা) জমে আছে। এসব বস্তা বিক্রির জন্য বিজেএমসি সুদানি নাগরিক আমিন আবদেল লতিফের সঙ্গে দুবাইভিত্তিক তায়েফ ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে চুক্তি করে। গত ৩০ জুলাই চুক্তিটি স্বাক্ষর করা হয়। বস্তাগুলো যাবে সুদানে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ১০০টি ‘স্ট্যান্ডার্ড বি টুইল’ বস্তার বাজারমূল্য ৯০ ডলার। ৩০০ বস্তায় হয় এক বেল। এ হিসাবে মোট দাম হয় অন্তত ২২৭ কোটি টাকা। এই মূল্যে বিজেএমসিরই তালিকাভুক্ত একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান বিদেশে বিক্রি করার জন্য দর প্রস্তাব করেছে গত ৩ আগস্ট। কিন্তু এর আগেই বিজেএমসি তিন ডলার কমে অর্থাৎ ৮৭ ডলার মূল্যে তায়েফ ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে সুদানি নাগরিক আমিন আবদেল লতিফের সঙ্গে চুক্তি করে ফেলে। এ হিসাবে মোট দাম হয় প্রায় ২১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিক্রির ক্ষেত্রেই বিজেএমসির আট কোটি টাকার মতো ক্ষতি হবে।

পাট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আমিন আবদেল লতিফ ১৯৯১-২০১৬ সাল পর্যন্ত সুদানে বাংলাদেশের অনারারি কনসাল ছিলেন। পাটের বস্তা ক্রয়ের জন্য নির্ধারিত সময় অর্থাৎ ৫ আগস্টের মধ্যে ১০ শতাংশ টাকা পরিশোধ করার কথা থাকলেও তা করতে পারেননি তিনি। এখন যে টাকা পরিশোধ করার চেষ্টা করছেন সেটাও বৈধ চ্যানেলে বাংলাদেশে আসেনি, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতির লঙ্ঘন। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতির লঙ্ঘন। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের (এফই সার্কুলার নম্বর-১২) অনুযায়ী, যদি সরাসরি রপ্তানি পণ্যের মূল্য সরকার নির্ধারিত চ্যানেলের মাধ্যমে না আসে এবং ক্রেতার নাম উল্লেখ না থাকে তাহলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রপ্তানি প্রণোদনা পাবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুদানি ওই ক্রেতার টাকা এসেছে ফেয়ারএফএক্স নামের লন্ডনের একটি মানি এক্সচেঞ্জ থেকে। কিন্তু বিজেএমসি চুক্তি করেছে দুবাইয়ে অবস্থিত তায়েফ ইন্টারন্যাশনাল ডিএমসিসির সঙ্গে। ফলে সুদানি নাগরিকের কাছে পাটের বস্তাগুলো বিক্রি হলে বিজেএমসি ২৬ কোটি টাকার রপ্তানি প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হবে। সব মিলিয়ে বিজেএমসির মোট লোকসান হবে ৩৪ কোটি টাকা।

জানা গেছে, চুক্তি ও শর্ত ভঙ্গের পরও প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চাপে কোটি কোটি টাকা লোকসান দিয়ে বিজেএমসি ওই সুদানি নাগরিকের কাছে পাট বিক্রি করতে চাচ্ছে। যা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

বিজেএমসি সূত্রে জানা গেছে, গত ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুদানি নাগরিকের পক্ষ থেকে বিজেএমসিকে টাকা পরিশোধ করা হয়নি। কারণ বৈদেশিক মুদ্রানীতি অনুযায়ী ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা না এলে এবং যে দেশে পাটের বস্তা রপ্তানি হচ্ছে সে দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আছে কি না সেটা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ডলারে মূল্য পরিশোধে বাধা আছে। বিদেশি মানি একচেঞ্জ থেকে বাংলাদেশের মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ডলার পাঠিয়েছেন সুদানি ওই ক্রেতা। মার্কেন্টাইল ব্যাংক থেকে বিজেএমসিকে এ বিষয়ে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।

গত ২ সেপ্টেম্বর মার্কেন্টাইল ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) শামীম আহমদে  বলেন, ‘যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকে তাহলে আমরা ডলার পরিশোধ করব না। আর যদি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে না থাকে তাহলে সমস্যা হবে না।’

জানা গেছে, বিজেএমসি থেকে ১০০টি পাটের বস্তা ৯০ ডলার মূল্যে রপ্তানি করতে চায় গোল্ডেন ফাইবার ট্রেড সেন্টার নামের একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান। এটি বিজেএমসির পাটপণ্য রপ্তানির সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান।

গোল্ডেন ফাইবারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশতাক হোসেন  বলেন, ‘দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দীর্ঘদিন পাটপণ্য রপ্তানি করছি। বিজেএমসিও আমাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি ও উৎসাহ দিচ্ছে। সম্প্রতি পাটের বস্তা রপ্তানি চুক্তি ভঙ্গ করার পরও দেশবিরোধী এক ক্রেতার প্রতি বিজেএমসির পক্ষপাতের সিদ্ধান্তে অবাক হলাম। সরকারি একটি প্রতিষ্ঠান কিভাবে নিজেদেরই আর্থিক ক্ষতি চায়?’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিজেএমসি থেকে পণ্য রপ্তানি করতে গেলে ৫ শতাংশ জামানত রাখলেই হতো। চলতি বছর সেটা হঠাৎ বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করা হয়। ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে পরে ৫০ শতাংশ করা হয়। কিন্তু সুদানি ক্রেতার ক্ষেত্রে সেটা অস্বাভাবিকভাবে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়।

বিজেএমসির চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ  বলেন, ‘চুক্তি করার কারণে তাদেরকে মাল দিতে হচ্ছে। না হয় আমাদের বিরুদ্ধে মামলা হলে বড় ভর্তুকি দেওয়া লাগতে পারে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিদেশিদের কাছে মাল বিক্রির চুক্তির পর দেশীয় উদ্যোক্তারা এসেছেন। এতে আমাদের কিছু করার ছিল না।’

বাংলাদেশ জুট গুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসাইন সোহেল  বলেন, ‘বিজেএমসি দেশীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তারা আমাদের বলেছে, ১০০টি পাটের বস্তার জন্য ৯০ ডলার মূল্যে ৫০ শতাংশ নগদ ও বাকি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে। অন্যদিকে বিদেশিদের কাছে ৮৭ ডলার মূল্যে মাত্র ১০ শতাংশ নগদে বিক্রির চুক্তি করে ফেলেছে। তারা যদি আমাদেরকে ১০ শতাংশ নগদের কথা বলত তাহলে দেশীয় উদ্যোক্তারা সহজেই এই সুযোগটা নিতে পারত।’

দেশীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুযায়ী এখনো টাকা পরিশোধ করতে পারেনি। তাই বিজেএমসি চাইলে এখনো দেশীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে পাটের বস্তাগুলো রপ্তানি করা সম্ভব। এতে বিজেএমসি নিজেই ৩৪ কোটি টাকা বেশি পাবে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY