ম্যানুয়াল কার্যক্রম চলছে ভার্চুয়াল আদালতে

করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে নিয়মিত আদালত বন্ধ থাকায় তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে ভার্চুয়াল আদালত।

ভার্চুয়াল উপস্থিতিকে সশরীরে উপস্থিতি হিসেবে গণ্য করে আদালতে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০ নামে গেজেট প্রকাশ করার পর থেকেই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর আংশিক চলছে ভার্চুয়ালি, বাকিটা আগের নিয়মেই ম্যানুয়ালি।

কার্যত ভার্চুয়াল আদালতে জামিন আবেদনের শুনানিই চলছে বেশি। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র ই-মেইলে বা ‘মাই কোর্ট’ নামের অ্যাপস-এর মাধ্যমে আবেদন দাখিল, শুনানি ও আদেশের কপি সংশ্লিষ্ট আদালত ও কারাগারে পাঠানোর কাজটি চলছে ভার্চুয়ালি। নথির নকলের কপি (সার্টিভাইট কপি), ওকালতনামা ও জামিননামাসহ বেশ কিছু কার্যক্রম আগের মতোই স্ব স্ব স্থানে শরীরিকভাবে উপস্থিত হয়ে দাখিল করতে হচ্ছে। অর্থাৎ ভার্চুয়াল আদালতে চলছে ম্যানুয়াল কার্যক্রম।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জামিন আবেদন দাখিলের আগে সংশ্লিষ্ট স্থান থেকে মামলার এজাহারের সার্টিফাইট কপি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কারাবন্দি কোনো আসামির পক্ষে আইনজীবীরা ওকালতনামা আইনজীবী সমিতি থেকে সংগ্রহের পর দাখিলের আগে তাতে কারাগার থেকে আসামির স্বাক্ষর আনতে হচ্ছে। একাজটিও চলছে ম্যানুয়ালি।

জামিন হওয়ার পর আদালতের আদেশ ভার্চুয়ালি অর্থাৎ অনলাইনে গেলেও জামিননামা সংশ্লিষ্ট আদালতের পেশকারের কাছে দাখিল করতে হচ্ছে আগের মতোই ম্যানিয়ালি। যেসব মামলায় সরাসরি জেলা জজ আদালতে জামিনের আবেদন করা হচ্ছে সেখানেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হচ্ছে। তবে নিম্ন আদালতের আদেশের পর একই পথ অনুসরণ করতে হচ্ছে। কারাগার থেকে এ কাজটি করতে হচ্ছে সশরীরে।

এছাড়া জামিননামা দাখিল করার সময় জামিনদারকে সশীরে আদালতে হাজির থাকতে হচ্ছে। ঠিক একইভাবে উচ্চ আদালতে অর্থাৎ হাইকোর্টে কোনো আসামির জামিন আবেদন অনলাইনে করার সুযোগ থাকছে। আবেদন করার আগে যে ওকালতনামা দাখিল করতে হচ্ছে তাতে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিতে উপস্থিত হয়ে সিল নিতে হচ্ছে।

আগে ৯০০ টাকার কোর্ট ফি লাগানোর ব্যবস্থা থাকলেও এনিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর সম্প্রতি সরাসরি সিল দেওয়ার পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। আবেদন দাখিলের সময় নিম্ন আদালতের আদেশসহ যেসব নথি দাখিল করতে হচ্ছে তার সত্যায়িত নকল কপি সশরীরে নকলখানা থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

এছাড়া জামিন আদেশ হওয়ার পর একই নিয়ম অনুসরণ করে একজন আসামিকে কারাগার থেকে মুক্তি পেতে হচ্ছে। আর দেওয়ানি আদালতে আবেদন দাখিল ও শুনানির বিষয়ে এরইমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট থেকে সশরীরে উপস্থিতির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রিমান্ড শুনানি ও আত্মসমর্পণকারী আসামির বিষয়ে শুনানি চলছে আগের মতোই ম্যানুয়ালি।

ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম  বলেন, সারা দেশে ভার্চুয়াল আদালত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আপদকালীন সময়ের জন্য এই ব্যবস্থা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে এটি স্থায়ী কোনো পদ্ধতি নয় যা এরইমধ্যে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বলেছেন।

আমিনুল ইসলাম আরো বলেন, আমাদের বিচার বিভাগকে ডিজিটাইজেশনের জন্য এটা একটা অগ্রগতি। কিন্তু এখন দেশে সেভাবে ভার্চুয়াল আদালত চলছে তা পুরোপুরি ভার্চুয়াল কার্যক্রম বলে চালানোর সুযোগ নেই। তিনি বলেন, এখন শুনানি, আদেশ প্রদান ও তা পাঠানোর কার্যক্রমটা চলছে ভার্চুয়ালি। কিন্তু বাকি কাজ চলছে আগের মতো। আইনজীবী, আইনজীবী সহকারীদের সশরীরে উপস্থিতির মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন করতে হচ্ছে। অর্থাৎ অর্ধেক কাজ হচ্ছে ভার্চুয়ালি। বাকি অর্ধেকটা ম্যানুয়ালি।

অ্যাডভোকেট আমিনুল বলেন, এরমধ্যেও কিছু কিছু কাজ ডিজিটাইজেশন করার সুযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে মামলা দায়েরের শুরু থেকই ডিজিটাইজেশন করতে হবে। একটি মামলা দাখিল হবার পর তা একটি সফটওয়ারের মধ্যে নিতে হবে। এরপর যাবতীয় কার্যক্রম তারমধ্যে গেলে তখন নকলের জন্য আর নকলখানায় যেতে হবে না। অনলাইনে আসামির স্বাক্ষর নেওয়া গেলেও আসামির স্বাক্ষরিত ওকালতনামা দাখিলের প্রয়োজন পড়বে না। বিচারক অনলাইনেই এসব কার্যক্রম পর্যবেক্ষন করতে পারবেন। এভাবেই ম্যানুয়ালি অনেক কাজ এড়ানো সম্ভব।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, হাইকোর্টে একটি জামিনের আবেদন করতে হলে তাকে নিম্ন আদালতের আদেশের কপিসহ যাবতীয় নথি দাখিল করতে হচ্ছে। এটি করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট নকলখানা থেকে সশরীরে হাজির হয়ে এসব সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ওকালতনামা, পেশকারের কাছে জামিননামা দাখিল সশরীরে উপস্থিতির মাধ্যমেই করতে হচ্ছে। ওকালতনামায় কারাগার থেকে আসামির স্বাক্ষর আনতে হচ্ছে আগের মতোই। অর্থাৎ কিছু কাজ ভার্চুয়ালি চললেও কিছু কাজ ম্যানুয়ালিই করতে হচ্ছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে ঘোষিত সাধারণ ছুটির কারণে গত ২৬ মার্চ থেকে নিয়মিত আদালত বন্ধ। একারণে ভার্চুয়াল আদালত চালু করতে রাষ্ট্রপতির নির্দেশনার আলোকে আইন মন্ত্রণালয় গত ৯ মে ভার্চুয়াল উপস্থিতিকে সশরীরে উপস্থিতি হিসেবে গণ্য করে আদালতে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০ নামে গেজেট প্রকাশ করে। এই অধ্যাদেশের ক্ষমতাবলে ভার্চুয়াল উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আদালতকে মামলার বিচার, বিচারিক অনুসন্ধান, দরখাস্ত বা আপিল শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক গ্রহণ, আদেশ বা রায় দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়।

এই অধ্যাদেশের ক্ষমতাবলে ১০ মে সুপ্রিম কোর্টসহ সারা দেশে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার জন্য ‘প্র্যাকটিস নির্দেশনা’ এবং  আইনজীবীদের জন্য ‘ভার্চুয়াল কোর্টরুম ম্যানুয়াল’ প্রকাশ করা হয়। এরপর ১১ মে থেকে ভার্চুয়াল আদালত কার্যক্রম শুরু হয়। আপিল বিভাগসহ সারা দেশে আদালতগুলোতে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শুনানি করা হচ্ছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY